বরিশাল, ২২শে জানুয়ারি, ২০১৮ ইং,৯ই মাঘ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ সর্বশেষ আপডেট: ৩ ঘন্টা আগে
শিরোনাম

লাইভ রিপোর্ট

চমক নিয়ে উদ্বোধনের অপেক্ষায় বাংলার নয়া টাইটানিক

জানুয়ারি ১৩, ২০১৮ ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

যাত্রীদের বিশ্বাস, বরিশাল-ঢাকা নৌ রুটে লঞ্চ ও ভিআইপি এবং প্রথম শ্রেণির কেবিনের আধুনিকতার ছোয়া এনে দিয়েছে সালমা শিপিং কোম্পানি। যেমনটি আনা হয়েছিলো বরিশাল-ঢাকা নৌ রুটের বিলাসবহুল এমভি কীর্তণখোলা-১ ও কীর্তনখোলা-২ লঞ্চটিতে। সেই থেকেই বরিশাল-ঢাকা রুটের নৌযান বর্ধিতকরনের পাশাপাশি শুরু হয় আধুনিকায়নের প্রতিযোগিতা। তবে নতুনের সাথে ব্যতিক্রমী কিছু সেবা নিয়ে আসছে সালমা শিপিং কর্পোরেশন। ঠিক তেমনি আধুনিক ও যাত্রী সেবায় নতুন চমক নিয়ে বরিশাল-ঢাকা নৌ পথে যুক্ত হচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ ও সর্বাধুনিক লঞ্চ এমভি কীর্তনখোলা-১০।

 

শুধু বরিশাল-ঢাকা রুটেই নয়, উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা সিসিইউ এবং হাসপাতাল যুক্ত লঞ্চটিই হতে যাচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ ও সর্বাধুনিক যাত্রীবাহী জলযান। অন্যান্য লঞ্চের তুলনায় ব্যতিক্রম চার তলা বিশিষ্ট কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চের নির্মান, অবকাঠামো, ডেকোরেশন, রং-তুলি সহ সার্বিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অপেক্ষা শুধু উদ্বোধনের। ফেব্রুয়ারীর শেষ অথবা মার্চ এর শুরুতেই বাংলার টাইটানিক খ্যাত এই লঞ্চটির উদ্বোধনের সময় নির্ধারণ হয়েছে। এমনই তথ্য জানিয়েছেন কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চের নির্মানকারী সালমা শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঞ্জুরুল আহসান ফেরদৌস।

 

জানা গেছে, বরিশাল-ঢাকা নৌ রুটে যাত্রীদের চাপ সামাল দেয়ার পাশাপাশি যাত্রীবাহী নৌ যানে আধুনিকায়নের ব্যতিক্রম চিন্তাধারা নিয়ে ২০১৬ সালের ২৫ মার্চ বেলতলা এলাকায় কীর্তনখোলা নদীর তীরে শিপ ইয়ার্ডে শুরু হয় এমভি কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চের নির্মান কাজ। ৫৯ ফিট প্রশস্ত এবং তিন শতাধিক ফুট দৈর্ঘ্যরে সর্ববৃহৎ এই লঞ্চটি নির্মান ও চলাচলের জন্য পুরোপুরিভাবে প্রস্তুতির জন্য লেগেছে দুই বছরের কম সময়। বর্তমান সময়ে বাংলার টাইকানিক খ্যাত লঞ্চটিতে অন্যান্য লঞ্চের মতই রয়েছে ভিআইপি, সেমি ভিআইপি, ডাবল এবং সিঙ্গেল অর্থাৎ প্রথম শ্রেণির কেবিনের ব্যবস্থা।

 

লঞ্চটির দ্বিতীয় এবং তৃতীয় তলা মিলিয়ে মোট ২০৪টি কেবিন রয়েছে। যার মধ্যে ডাবল কেবিনের সংখ্যা ৭৫টি এবং সিঙ্গেল কেবিন ১০৬টি। বাকি কেবিনের মধ্যে বিজনেস ক্লাস ৬টি। ফ্যামিলি ভিআইপি ৫টি’র মধ্যে দ্বিতীয় তলায় একেবারেই সামনের অংশে ২টি ও তৃতীয় তলায় ৩টি ফ্যামিলি ক্যাবিন রয়েছে। পেছনের অংশে সিড়ি’র পাশেই রয়েছে আরো ৪টি ফ্যামিলি কেবিন। তৃতীয় তলায় ফ্রন্ট সাইডে রয়েছে আরো তিনটি এক্সিকিউটিভ ভিআইপি। সেন্ট্রাল এসির আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে প্রত্যেকটি কেবিন। বিজনেস ক্লাস, ফ্যামিলি ভিআইপি কেবিন গুলোতে রয়েছে সংযুক্ত বাথরুম। এসব কেবিন থেকে দেখা যাবে নদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

 

শুধু তাই নয়, অন্যান্য লঞ্চের থেকে কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চের ব্যতিক্রম বিষয় হচ্ছে কেবিনের প্রশস্ততা। এক একটি সিঙ্গেল কেবিনে দু’জন মানুষ অনায়াসে ভ্রমন করতে পারবেন। তার পরেও চলাচল এর জন্যও থাকছে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। মনোরম ডেকোরেশন ও সুসজ্জিত কেবিন গুলোতে রয়েছে এলইডি টিভি, বৈদ্যুতিক ফ্যান সহ অন্যান্য ব্যবস্থা। তাছাড়া ফ্যামিলি ভিআইপি কেবিনের জন্য করা হয়েছে পৃথক পৃথক বারান্দার ব্যবস্থা। যেখানে রয়েছে জানালার ব্যবস্থাও। এদিকে লঞ্চে রয়েছে সিসিইউ, হাসপাতাল, এসি মসজিদ এবং ডুপ্লেক্স সিড়ি। যা বরিশাল-ঢাকা নৌ রুটে চলাচলকারী অন্য কোন লঞ্চে নেই। একটি সিসিইউ ছাড়াও রয়েছে এসি সমৃদ্ধ ৩ বেডের হাসাপাতাল। যেখানে রয়েছে সংযুক্ত বাথরুমের ব্যবস্থা। লঞ্চটিতে রয়েছে এসি দ্বারা সমৃদ্ধ মসজিদ। যেখানে এক সঙ্গে ৩০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবে। সব থেকে বড় আধুনিকায়ন ও দর্শনীয় দৃশ্য হলো কীর্তনখোলা-১০ এর ডুপ্লেক্স সিঁড়ি। যা বরিশাল তথা দেশের অন্য কোন লঞ্চ বা জাহাজে এমন দৃষ্টি নন্দন সিঁড়ির ব্যবস্থা নেই। যে সিঁড়ি শুধুমাত্র আলিশান বাড়ির ক্ষেত্রেই মানানসই। সেই ডুপ্লেক্স সিঁড়ি কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চে নির্মান করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন লঞ্চ নির্মানকারী প্রতিষ্ঠান।

 

সরেজমিনে দেখা গেছে, অন্যান্য লঞ্চের উপরে ওঠার সিঁড়ি দিয়ে সর্বোচ্চ ২ থেকে ৩ জন এক সঙ্গে উঠতে পারেন। কিন্তু কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চের ফ্রন্ট সাইডের সিঁড়ি বেড়ে অনায়াসে এক সঙ্গে ১০ জনের বেশি যাত্রী উঠা-নামা করতে পারবেন। সিঁড়িটির সৌন্দর্য বর্ধণে ব্যবহার করা হয়েছে থাইলান্ডের উডেন। উপরে উঠার সিঁড়ি গুলোতে ১৪ ইঞ্চি করে স্পেস রয়েছে। যাতে করে একজন মানুষ অনায়াসে যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে করেই উঠা-নামা করতে পারবে। মনোরম সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে কেবিনের বারান্দায়। কেবিনে লঞ্চের পেছনের অংশে তাকিয়ে একেবারে পিছন থেকে সামনে পর্যন্ত প্রত্যক্ষ করতে পারবেন যাত্রীরা। আর

এই ব্যবস্থা শুধুমাত্র কীর্তনাখোলা-১০ লঞ্চেই রয়েছে। গোটা লঞ্চের মধ্যে যাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘবে ৪২টি বাথ রুমের ব্যবস্থা রয়েছে। তাছাড়া তৃতীয় তলায় কেবিনের যাত্রীদের জন্য পেছনের অংশে ৫টি এবং মাঝখানে আরো ৬টি বাথরুমের ব্যবস্থা রয়েছে। যাত্রীদের দুর্ভোগ এবং কেবিনের সংকট কমিয়ে আনতে লঞ্চের স্টাফদের জন্যও করা হয়েছে ভিন্ন ব্যবস্থা। তাদের জন্য চতুর্থ তলায় মাষ্ট্রার ব্রিজের পেছনে ব্যবস্থা করা হয়েছে কেবিন। পানির ট্যাংকি স্থাপন করা হয়েছে লঞ্চের ছাদে।

 

তাছাড়া লঞ্চের তৃতীয় তলায় মাষ্টার ব্রিজের পেছনে রয়েছে ¯œ্যাক্স, কফি হাউস ও ওয়াইফাই জোন। যা সকলের জন্য উম্মুক্ত। এছাড়া ভিআইজি লাউঞ্জেও রয়েছে উন্মুক্ত ওয়াইফাই ব্যবস্থা। মিনি চাইনিজ, কফিশপ, খাবার হোটেল ছাড়াও শিশুদের জন্য রয়েছে কিড্স জোন, মোবাইল রিচার্জের জন্যও নিচ তলা ও দো-তলায় রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। ডেকের যাত্রীদের মোবাইল চার্জের জন্য রয়েছে ১৬০টি পয়েন্ট। যেখানে ১৬০টি মোবাইলে এক সঙ্গে চার্জ দেয়া সম্ভব হবে। লঞ্চ জুড়ে রয়েছে অত্যাধুনিক ডিজিটাইল লাইট। লঞ্চের সৌন্দর্য্য ও শোভাবৃদ্ধির লক্ষ্যে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে এই প্রথম বারের মত বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ব্রোঞ্জ ও সুসজ্জিত দরজার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যা ইতিপূর্বে কোন লঞ্চ করতে পারেনি বলে জানিয়েছেন সালমা শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঞ্জুরুল আহসান ফেরদৌস।

 

তাছাড়া লঞ্চটিতে রয়েছে লাইফ বয়া, ফায়ার প্রতিরোধক ও বিশুদ্ধ পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। লঞ্চ পরিচালনার জন্য রয়েছে উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ। সর্বাধিক হর্সপাওয়ার ক্ষমতা সম্পন্ন দুটি ইঞ্জিনের পাশাপাশি রয়েছে হাইড্রোলিক ও ম্যানুয়াল ব্রেক। চলার পথে একটি ফেল করলে অপরটি দিয়ে লঞ্চ নিয়ন্ত্রনে আনা সম্ভব হবে। লঞ্চ পরিচালনায় রয়েছে কম্পাস, ইকোসাউন্ডার, রাডার সহ আরো আধুনিক ব্যবস্থা। এর ফলে নৌ দুর্ঘটনা কিংবা মাঝ নদীতে চরে লঞ্চ আটকে যাওয়ার চিন্তা মুক্ত থাকবেন যাত্রীরা। সার্বক্ষনিক বিদ্যুৎ সুবিধার জন্য থাকছে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন জেনারেটর ব্যবস্থাও।

 

সালমা শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঞ্জুরুল আহসান ফেরদৌস বলেন, বরিশাল-ঢাকা নৌ পথে যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধি এবং নৌ যানের আধুনিকায়ন একমাত্র আমরাই প্রথম করেছি। রাডার, ইকোসাউন্ডার সহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কথা কীর্তনখোলা ছাড়া আর কেউ জানতোই না। কীর্তনখোলা-১ লঞ্চে এসব পদ্ধতি আমরাই সর্বপ্রথম চালু করেছি। আমি সব সময় ভেবেছি যাত্রী সেবার মান উন্নয়নের কথা। তাই সব সময় সবার থেকে ব্যতিক্রম কিছু করার চেষ্টা করে আসছি। যাতে অন্য লঞ্চগুলোতেও যেন যাত্রী সেবার মান উন্নয়নের পরিবর্তন আসে। তিনি বলেন, কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চটি নির্মানের ক্ষেত্রে সম্পুর্ন বিদেশী প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছে। দেশে জাহাজ শিল্পে আধুনিকায়ন এবং অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বিভিন্ন দেশে ঘুরেছি। সেসব দেশ থেকেই জাহাজ নির্মানে আধুনিকায়ন এবং যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধির বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই কীর্তনখোলা-১০ নির্মান করা হয়েছে। এমনকি এতো অল্প সময়ের মধ্যে একটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দ্বারা সু-সজ্জিত লঞ্চ নির্মান করাটাও সফলতার একটা অংশ হিসেবে দেখছেন মঞ্জুরুল আহসান ফেরদৌস।

 

তিনি বলেন, একজন কেবিনের যাত্রী অধিক টাকা ব্যয় করে লঞ্চে ভ্রমন করছে। কিন্তু তারা কতটুকু যাত্রী সেবা পাচ্ছেন তা তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে যাত্রী সেবা বৃদ্ধি করার বিষয়টি আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছি। এজন্য লঞ্চটিতে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রথম শ্রেণির মাষ্টার, প্রথম শ্রেণির চালক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য আনসার বাহিনী ছাড়াও কেবিনের যাত্রীদের সহযোগিতায় একঝাক উদ্যমী কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। লঞ্চের ডেক কিংবা কেবিনের বাথরুম গুলোতে দুর্গন্ধে যাত্রীরা ব্যবহার করতে পারে না। তাই চলার পথে কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চের প্রতিটি বাথ রুম প্রতি এক ঘন্টা পর পর পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন লঞ্চ মালিক মঞ্জুরুল আহসান ফেরদৌস। তিনি বলেন, কেবিনের টিকেট নিয়ে কালোবাজারি বন্ধ করাটাই আমাদের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। ইতিপূর্বেই কীর্তনখোলা লঞ্চের কেবিনের টিকেট এর কালোবাজারি বন্ধ করেছি। কেবিন খালি থাকলে যাত্রীদের মধ্যে যিনিই আগে এসেছেন তিনিই একমাত্র টিকেট পেয়েছেন। কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটবে না। আমরা কথায় বিশ্বাসী নই, বরং কাজে বিশ্বাসী। তাই যাত্রীরা অন্তত পক্ষে একবার করে কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চটিতে ভ্রমন করলেই কথা এবং কাজের সাথে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাবেন বলে আমার বিশ্বাস।

Facebook Comments

পাঠকের মতামত:

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য
TECHNOLOGY: SPIDYSOFT IT GROUP